দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মা–শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সেই সাফল্য এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ২৮ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত পদের বড় অংশে জনবল না থাকায় স্বাস্থ্যশিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ এবং মাতৃসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।
২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে মোট অনুমোদিত পদ ৫৪ হাজার ২২৬টি। এর মধ্যে বর্তমানে ১৪ হাজার ৯৮১টি পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ২৮ শতাংশ। কর্মকর্তারা বলছেন, তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় বাস্তবে শূন্যপদের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পরিবারকল্যাণ সহকারী। এই পদে অনুমোদিত সাড়ে ২৩ হাজারের বেশি পদের মধ্যে ৪ হাজার ১৮৮টি এখনো খালি। ইউনিয়ন পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা ৩৭১টি পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের পদও পুরোপুরি শূন্য।
এ ছাড়া সারা দেশের প্রায় আড়াই হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৮টিতে কোনো মেডিক্যাল অফিসার নেই।
জেলা পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রাজশাহীতে প্রায় ৩৬ শতাংশ, ফরিদপুরে ৩৯ শতাংশ পদ শূন্য। ফরিদপুরে মোট ৩৩টি পদের মধ্যে ৮টিতে একজন কর্মীও নেই। মিডওয়াইফ ও সহকারী পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও সেখানে পুরোপুরি খালি।
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ৪৪ শতাংশ এবং গাইবান্ধায় ৩৮ শতাংশ পদে জনবল নেই। ফলে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিতরণ, গর্ভবতী মা ও নবজাতকের নিয়মিত সেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, একজন কর্মীকে তিনজনের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সেবার মান ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতাই এই সংকটের মূল কারণ। সর্বশেষ ২০২০ সালে ৩৬টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও পাঁচ বছরে মাত্র ৯টি ক্যাটাগরির নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২৭টি ক্যাটাগরির নিয়োগ এখনো ঝুলে আছে।
নিজস্ব নিয়োগবিধি না থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হয় অধিদপ্তরকে। ২০২২ সালের পর নতুন করে কোনো পদের অনুমোদন না আসায় ফলাফল প্রস্তুত থাকলেও নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। আদালতে চলমান মামলাসংক্রান্ত জটিলতাও নিয়োগ আটকে রাখছে। খাগড়াছড়িতে জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগও আদালতের স্থগিতাদেশে বন্ধ রয়েছে।
এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ তিনটি দপ্তর একীভূত করে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর’ গঠনের আলোচনা চলছে। এতে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বেড়েছে। নতুন কাঠামোয় নিয়োগ ও পদোন্নতির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান জানান, নতুন একটি নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে সারা দেশের শূন্যপদের তালিকা সংগ্রহ করে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।
তবে জনবল সংকট নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ।